বুধবার, ২ মে, ২০১৮

পিতা-মাতার বৈশিষ্ট্য কিভাবে সন্তানের শরীরে আসে?

আমরা যখন সবাই ছোট থেকে বড় হলাম অনেক অনেক নতুন বিষয়ের সাথে আমরা নিশ্চই আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করেছিযে প্রায় সকল সন্তানই তার পিতা বা মাতার মত দেখেতে হয়। পিতা বা মাতার মত দেখতে না হলেও কোনো নিকটাত্মীয়, বিশেষ করে দাদা-দাদী বা নানা-নানীর মত দেখতে হয়। আমরা এটাও খেয়াল করেছি যে কোনো পিতা-মাতা ফর্সা হলে সন্তানও ফর্সা হয়, অথবা পিতা-মাতা কালো হলে সন্তানও কালো হয়।অর্থাৎ পিতা-মাতার বৈশিষ্ট্য সচরাচর সন্তান-সন্ততির মধ্যে প্রকাশিত হয়। পিতা-মাতার বৈশিষ্ট্য কি করে সন্তান-সন্ততির মধ্যে প্রকাশিত হচ্ছে তা নিয়ে আমাদের অনেকের মনেই নানাবিধ প্রশ্ন রয়েছে। নিচের আলোচনার মাধ্যমে আমরা এই প্রশ্নেরই উত্তর জানার চেষ্টা করব।

পিতা-মাতার বৈশিষ্ট্য যে প্রক্রিয়ায় সন্তান-সন্ততির শরীরে প্রবেশ করে তাকে বংশগতি বলে। আর পিতা-মাতার যে সকল বৈশিষ্ট্য সন্তান-সন্ততির শরীরে প্রবেশ করে সে সকল বৈশিষ্ট্যকে বংশগতির বৈশিষ্ট্য বলে। পিতার/মাতার গায়ের রঙ কালো হলে সন্তান কালো হবে বা রঙ ফর্সা হলে ফর্সা হবে, অথবা পিতা/মাতা রাগী হলে সন্তান রাগী হবে ইত্যাদি। এক্ষেত্রে গায়ের রঙ বা রাগ হচ্ছে বংশগতির বৈশিষ্ট্য। সুতরাং দেখাই যাচ্ছে, পিতা-মাতার বৈশিষ্ট্য আমাদের শরীরে কি ভাবে আসছে সেটা জানতে হলে আমাদের কে আগে জনতে হবে এই বৈশিষ্ট্য জিনিসটা আসলে কি? তার স্বরূপ কি? সে দেখতে কেমন? বা সে থাকে কোথায়? এই প্রশ্ন গুলোর উত্তর জানতে হলে আমাদেরকে আগে থেকে জীব দেহের গঠনের কয়েকটা সাধারণ ধারণা সম্পর্কে জেনে নিতে হবে।
 
জীবদেহের সাধারণ গঠন সম্পর্কে প্রথমে যে বিষয়টা আমাদের জানা জরুরী তা হল জীবদেহের রাসায়নিক গঠন। রাসায়নিক দিক দিয়ে আমাদের দেহ প্রোটিন দিয়ে গঠিত। আবার এই প্রোটিন গঠিত হয় অনেকগুলি অ্যামাইনো এসিডের সমন্বয়ে। আমাদের দেহের মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত সবকিছুই প্রোটিন দ্বারা গঠিত। এমন কি থুথু বা লালা সেটাও প্রোটিন দ্বারা গঠিত।বিভিন্ন প্রকার প্রোটিন মিলেই তৈরী হয় বিভিন্ন কোষীয় অঙ্গানু। এই বিভিন্ন প্রকার কোষীয় অঙ্গানু আবার একসাথে তৈরী করে কোষ। অনেক গুলো কোষ আবার একসাথে তৈরী করে টিস্যু বা কলা। অনেক গুলো কলা একসাথে তৈরী করে অঙ্গ। অনেক গুলো অঙ্গ একসাথে তৈরী করে তন্ত্র। অনেক গুলো তন্ত্র আবার একসাথে হয়ে তৈরী করে আমাদের দেহ। অর্থাৎ দেহের গাঠনিক একক গুলো পর্যায় ক্রমে সাজালে আমরা নিচের মত ক্রমবিন্যাস পাব-

তাহলে আমরা সরাসরি বলতে পারি প্রোটিনই হল আমাদের জীবদেহের রাসায়নিক ভিত্তি। এখানে উল্লেখ্য যে আমাদের শরীরের বিভিন্ন প্রকার অঙ্গ বিভিন্ন প্রোকার প্রেটিন দ্বারা গঠিত। এজন্যই আমাদের বিভিন্ন অঙ্গ বিভিন্ন রকম। আমাদের ত্বক, চোখ, ফুসফুস, কিডনী, যকৃত, অন্ত্র বিভিন্ন অংশের কোষ গুলো বিভিন্ন রকম। কারন তাদেরকে তৈরী করা প্রোটিন গুলো হচ্ছে বিভিন্ন করম। তাহলে আমরা বলতে পারি আমাদের দেহ বিভিন্ন প্রকার প্রোটিন দ্বারা গঠিত। আসলে আমাদের দেহের বিভিন্ন অংশ কয়েক হাজার প্রকার প্রোটিন দ্বারা গঠিত।এই সকল প্রকার প্রোটিন আবার মাত্র বাইশ প্রকার অ্যামাইনো এসিড দ্বারা গঠিত। ইংরেজি বর্ণমালার ছাব্বিশটি বর্ণ মিলিয়ে যেমন আমরা হাজার হাজার শব্দ তৈরী করতে পারি ঠিক তেমনি বাইশ প্রকার এমাইনো এসিড বিভিন্ন ভাবে, বিভিন্ন অনুপাতে, বিভিন্ন আঙ্গিকে যুক্ত হয়ে হাজার হাজার প্রোটিন তৈরী করতে পারে।

আমরা এত সময় দেখলাম অ্যামাইনো এসিড প্রোটিন তৈরী করে আর প্রোটিন আমাদের দেহ তৈরী করে। এখন স্বভাবতই প্রশ্ন আসে অ্যামাইনো এসিডকে কে তৈরী করে। আসলে অ্যামাইনো এসিডকে তৈরী করে রাইবো নিউক্লিক এসিড বলে এক ধরনের নিউক্লিক এসিড যাকে আমরা সংক্ষেপে RNA বলে ডাকি। তাহলে এখন আবার আমাদের মনে প্রশ্ন আসে রাইবো নিউক্লিক এসিডের উৎপত্তি কোথায় বা সে কি করে অ্যামাইনো এসিড বা প্রোটিন তৈরী করে। RNAর উৎপত্তি সম্পর্কে আমরা পরে আলোচনা করছি, আগে দেখে নিই RNA কি করে প্রোটিন তৈরী করে অর্থাৎ সে কি করে বোঝে কোন অ্যামাইনো এসিড উৎপন্ন করতে হবে বা কোন অঙ্গ কোন প্রোটিন দিয়ে তৈরী হবে। আসলে RNA এর কাছে একটা বই আছে। সেই বইতে ধারাবাহিক ভাবে সবকিছু লেখা আছে। অর্থাৎ কোন অঙ্গ কোন প্রোটিন দিয়ে তৈরী হবে, তা দেখতে কেমন হবে বা তার স্বভাব চরিত্র কেমন হবে সবই এই বইাতে কিছু বিশেষ রাসায়নিক কোডে লিখা আছে। এই বইটার নাম হচ্ছে ডিঅক্সিরাইবো নিউক্লিক এসিড, যাকে সংক্ষেপে DNAবলা হয়। RNA আসলে DNAর কাছে রাসায়নিক কোডিং পদ্ধতিতে লিখে রাখা কোড গুলোকে পড়তে পারে এবং তদনুযায়ী অ্যামাইনো এসিড তৈরী করে। ফলে তদনুযায়ী প্রোটিন এবং তার থেকে ক্রমান্বয়ে জীব দেহ তৈরী হয়।

তাহলে আমাদেরকে এখন RNA এবং DNAসম্পর্কে জানতে হবে। এর সাথে আমাদের দেহের উৎপত্তিরও হালকা একটা ধারণা আমাদের দরকার। RNA এবং DNAএর পূর্ণ রূপ আমরা জেনেছি। এরা থাকে কোষের অভ্যন্তরে।কোষ হচ্ছে আমাদের দেহের গাঠনিক এবং কার্যকরী একক।অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কোষ একটার পর একটা যুক্ত হয়ে তৈরী করে আমাদের দেহ।কোষ আবার অনেক গুলো কোষীয় অঙ্গানু দ্বারা গঠিত।কোষের মাঝে যে গাড় গোলাকার বস্তুটি দেখা যায় তাকে নিউক্লিয়াস বলে। নিউক্লিয়াসের মাঝে আঁকা বাঁকা প্যাঁচানো সূতার মত একটি অংশ দেখা যায় যোকে ক্রোমোসোম বলে। এই ক্রোমোসোমেই থাকে RNA এবং DNA।

DNAডানদিকে প্যাচানো লোহার সিড়ির মত গঠন বিশিষ্ট।সিড়ির ধাপগুলো তৈরী হয় চার প্রকার নাইট্রোজেন ক্ষারের ক্রমিক সংযুক্তির মাধ্যমে। নাইট্রোজেন ক্ষারের এই ক্রমিক সংযুক্তিকেই বলা হয় রাসায়নিক কোড। DNAএরকম হাজার হাজার রাসায়নিক কোডের সমন্বয়ে গঠিত।পরপর অবস্থিত ক্রোমিক কিছু কোড যা DNAএর একটা নির্দিষ্ট জায়গা জুড়ে অবস্থান করে তা আমাদের দেহের একটি সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বহন করে। এই সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বহন কারী ডি এ এর খণ্ডাংশকেই জিন বলে।যেহেতু জিনই আমাদের দেহের সুনির্দষ্ট বৈশিষ্ট্য বহন করে সেহেতু আমরা বলতে পারি আসলে আমাদের দেহের যে কোনো বৈশিষ্ট্যের রাসায়নি ভিত্তি হল জিন। তাহলে আমরা জানলাম বংশগতির বৈশিষ্ট্যের ভৌত ভিত্তি কি এবং তা কোথায় থাকে।

উপরে আমরা দেখছি জিন হচ্ছে কতকগুলো রাসায়নিক সংকেতের সমষ্টি যা DNAএর একটা নির্দিষ্ট স্থান জুড়ে অবস্থান করে।জিনে থাকা এই কোড গুলোতেই থাকে প্রোটিন তৈরীর ফর্মুলা। RNA এই প্রোটিন তৈরীর ফর্মুলা পড়তে পারে এবং সেই অনুসারে প্রোটিন তৈরী করে, যেই প্রোটিন আমাদের দেহ গঠন করে। DNA তে হাজার রকম জিন থাকে যাতে থাকে হাজার রকম প্রোটিন তৈরীর ফর্মুলা। যেই ফর্মুলা মাফিক RNA হাজার রকম প্রোটিন দ্বারা আমাদের এই দেহ গঠন করে।

আমরা একটু আগেই বলছিলাম আমাদের দেহ হাজার হাজার কোষ দ্বারা গঠিত। এই হাজার হাজার কোষ আবার মাত্র একটি কোষ হতেই বিভাজনের মাধ্যমে উৎপন্ন হয়েছে। এই একটি মাত্র কোষের নাম জাইগোট। জাইগোট নামক এই একটি মাত্র কোষই বিভাজত হয়ে ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন কোষের আমাদের এই দেহ তৈরী করেছে। প্রশ্ন জাগে জাইগোট কোষটি আবার কোথা থেকে সৃষ্টি হল। আসলে জাইগোট সৃষ্টি হয় দুটি জনন কোষের মিলনের ফলে। আমরা জানি মানুষ যৌন প্রজনন কারী জীব। যৌন প্রজননের সময় পিতার দেহ হতে শুক্রানু এবং মাতার দেহের ডিম্বানু মিলিত হয়ে জাইগোট তৈরী করে।পুংজনন কোষ অর্থাৎ শুক্রাণুতে থাকে পিতার DNAএবং স্ত্রী জনন কোষ অর্থাৎ ডিম্বানুতে থাকে মায়ের DNA। সুতরাং জাইগোটের DNAতে পিতা এবং মাতা উভয়ের DNAথাকবে।এই DNAতে থাকবে উভয়ের জিন।সুতরাং উভয়ের জিনের বৈশিষ্ট্য মিলে জাইগোট থেকে ক্রমান্বয়ে বিভাজনের মাধ্যমে সন্তানের সৃষ্টি হবে যাতে থাকবে পিতা মাতা উভয়ের বৈশিষ্ট্য।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Class 8 : Science : Chapter 01: Classification of Animal World : MCQ test For The Mollusca Phylum

Mollusca Quiz - Mithun Sir Phylum Arthropoda Quiz Check Results ...