বুধবার, ২ মে, ২০১৮

জ্বালানী বিহীন ইঞ্জিন- সম্ভাব্যতার একটি বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা

বলতে গেলে আমাদের বর্তমান মানব সভ্যতা একক ভাবে যে বিষয়টির উপর নির্ভরশীল তার নাম বিদ্যুৎ। বিদ্যুৎ ছাড়া আমাদের জীবন-সভ্যতা বলতে গেলে স্থবির। তাই বিদ্যুৎ উৎপাদন বর্তমান বিশ্বে সর্বধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে একটি। সমগ্রবিশ্বে কিভাবে সহজ উপায়ে, পরিবেশ বান্ধব ভাবে, সল্প বিনিয়োগে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় তা নিয়ে বিপুল পরিমাণে গবেষণা হচ্ছে। তাই বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন প্রযুক্তির খবর সব সময়ই সকলের মনোযোগ কাড়ে, মিডিয়া কাভারেজ বেশি পায়। তাই এই মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা মাঝে মাঝেই জ্বালানী বিহীন বিদ্যুৎ উৎপাদনের খবর জানতে পারি। কিছু দিন পর পরই আমারা প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাধ্যমে শুনতে পাই বাংলাদেশের কোন রহিম, করিম নামের গ্রামের এক ব্যক্তি এমন ইঞ্জিন আবিস্কার করেছে যা জ্বালানী ছাড়াই চলবে।তা দিয়ে নাকি বিদ্যুৎও উৎপাদন করা যাবে। আাবার শুনি পানি দিয়ে ইঞ্জিন তৈরী করে তা দিয়ে মোটর সাইকেল বা গাড়ি তৈরী করেছে কোনো এক স্বশিক্ষিত উদ্ভাবক। আমাদের বেকুব ও হিটখোর সাংবদিক, ক্ষেত্র বিশেষে কেনো কেনো প্রতিষ্ঠিত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এ বক্তব্য গুলোকে সত্য বলে ধরে নিয়ে, এর পেছনের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে কিনা বা এর পেছনের তত্ব কি তা যাচাই-বাছাই না করে প্রচার করা শুরু করে। এতে বিভ্রান্ত হয়ে আমাদের সাধারণ জনগণ ও ফেসবুক ব্যবহারকারীগণ তা শেয়ারে শেয়ারে ভরিয়ে ফেলেন। অনেকে তো অর্থ সাহায্য কামনা করেন গবেষণা চালিয়ে নিয়ে যাবার জন্য। কিছুদিন আগে আমার কোনো এক ফেসবুক বন্ধুর শেয়ার করা পোস্টে দেখলাম জনৈক শরীফুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি সাত বছর যাবত গবেষণা করে এবং সাড়ে তিনশত বার ব্যর্থ হয়ে অবশেষে জ্বালানী বিহীন সংয়ক্রিয় ইঞ্জিন আবিস্কার করতে সক্ষম হয়েছেন বলে দাবি করেছেন। তার কাজ আরো ভালোভাবে করার জন্য এবং চিনে গিয়ে প্রকল্প গ্রহণ করার জন্য তিনি প্রধানমণ্ত্রীর সহায়তা কামনা করছেন। তার এই পোস্টটি ফেসবুকে একুশহাজার ছয়শ বারের বেশী শেয়ার হয়েছে এবং চৌদ্দ হাজার জনের বেশী লাইক দিয়েছেন। তাই জ্বালানী বিহীন ইঞ্জিন আবিস্কারের বাস্তবে সম্ভাব্যতা নিয়ে বিজ্ঞানের নগণ্য ছাত্র হিসেবে আমি আমার মতামত তুলে ধরছি এ লেখায়।

প্রথমত আমাদের জানতে হবে ইঞ্জিনের সাধারণ কাজ কি? খুব সহজভাবে বলতে গেলে বলতে হয় ইঞ্জিনের কাজ হল শক্তির রূপান্তর ঘটানো। অর্থাৎ ইঞ্জিন শক্তিকে এক রূপ থেকে অন্য রূপে পরিবর্তন করে। যেমন উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি আমারা বাতাস পাই যে ফ্যানের মাধ্যমে তা বিদ্যুৎ শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তর করে। বৈদ্যুতিক বাল্ব বিদ্যুৎ শক্তিকে আলোক ও তাপ শক্তিতে রূপান্তরিত করে। আমাদের দেহ খাদ্যের মধ্যে বিদ্যমান রাসায়নিক শক্তিকে তাপ শক্তিতে রূপান্তরিত করে। ঠিক তেমনি ভাবে কোনো গাড়ির ইঞ্জিন তাতে ব্যবহৃত জ্বালানীর মধ্যে বিদ্যমান রাসায়নিক শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে পরিণত করে। এখানে খেয়াল রাখতে হবে শক্তি কিন্তু কেও উৎপাদন করছে না। যা করছে তা হচ্ছে শক্তির রূপান্তর। মহাবিশ্বে যত শক্তি আছে সকল শক্তির পরিমাণ সমান। তা বাড়ছেও না আবার কমছেও না (ভরশক্তি উপেক্ষা করে মোটা দাগে)। শক্তির শুধু রূপের অন্তর হচ্ছে মাত্র। “শক্তির সৃষ্টি বা ধ্বংস নেই শুধু রূপান্তর আছে মাত্র”- পদার্থ বিজ্ঞানের অন্যতম মৌলিক সূত্রগুলোর মধ্যে এটা একটা।
তাহলে আমরা দেখলাম শক্তির কোনো সৃষ্টি বা ধ্বংস নেই, তার শুধু রূপের পরিবর্তন হয় মাত্র। আপনি যে কোনো যন্ত্র দেখেন না কেন সেখানে শুধু শক্তির পরিবর্তন ই দেখবেন। যে কোনো বিদ্যুৎ কেন্দ্র দেখেন। সেখানে দেখবেন হয় পানির বিভব শক্তি বা কয়লা বা পেট্রোলিয়াম তেলের রাসায়নিক শক্তি বা বায়ুর যান্ত্রিক শক্তি বা পরমাণুর নিউক্লিয়াসের শক্তিকে বিদ্যুৎ শক্তিতে রূপান্তর করা হচ্ছে। এই রূপান্তরেরও একটা ধরণ আছে। তা হচ্ছে এমন কোনো যন্ত্র এখন পর্যন্ত আবিস্কার হয়নি যা শতভাগ শক্তির রূপান্তর করতে পারে। অর্থাৎ কোনো যন্ত্রের ইনপুটে আপনি যে পরিমাণ শক্তি দিবেন আউটপুটে সে পরিমাণ শক্তি পাবেন না। কারণ যন্ত্রটি যখন কাজ করবে তার বেশ বড় একটা অংশ তাপ বা শব্দ বা অন্য কোনো শক্তি হিসেবে সে নষ্ট করবে। যেমন একটি সাধারণ ডিজেল ইঞ্জিনের কর্মদক্ষতা মাত্র 27%| অর্থাৎ আপনি একটি ডিজেল ইঞ্জিনে 100 কি.মি. চলার মত শক্তি দিলে তা মাত্র 27 কি.মি. যাবার মত শক্তি ব্যয় করবে আর বাকি অংশ তাপ ও শক্তি হিসেবে নষ্ট করবে। তাই আমারা দেখছি শতভাগ কর্ম দক্ষতার ইঞ্জিন এখন পর্যন্ত আবিস্কার করা যায়নি।
তাহলে আমরা দেখছি শক্তি উৎপাদন করা যায়না শুধু রূপান্তর করা যায়। আর কোনো যন্ত্রের মাধ্যমে শক্তির রূপান্তর ঘটাতে চাইলে শক্তির কিছু অংশ অপব্যায়িত হয়। সুতরাং যদি কোনো ইঞ্জিন বানাতে হয় তাহলে অবশ্যই তাতে শক্তির যোগান দিতে হবে অর্থাৎ তার জ্বালানী অবশ্যই লাগবে। যদি যন্ত্রটির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়, তবে যন্ত্রটি যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপন্ন করবে তার থেকে বেশী শক্তি সে ব্যবহার করবে ঐ পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপন্ন করতে। সুতরাং আমরা বলতেপারি জ্বালানী বিহীন কোনো ইঞ্জিন আবিস্কার করা সম্ভব নয়। এটা অবান্তর এবং অলীক ভাবনা। কেউ যদি এ দাবি করে তবে বুঝতে হবে তার পদার্থ বিজ্ঞানের ন্যূনতম জ্ঞানও নেই।
শরীফুল ইসলামের পোস্টের লিংক
https://www.facebook.com/permalink.php?story_fbid=1116365521751896&id=10...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Class 8 : Science : Chapter 01: Classification of Animal World : MCQ test For The Mollusca Phylum

Mollusca Quiz - Mithun Sir Phylum Arthropoda Quiz Check Results ...